মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ইতিহাস-ঐতিহ্য

উপজেলার ঐতিহ্য

জাতিগত বৈশিষ্ট্য  আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলানিকেতন বান্দরবান  সদর উপজেলায়  বাঙ্গালী ও ১১ টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস। এ উপজেলা বোমাং সার্কেলের অন্তভুর্ক্ত।

উচপ্রু চৌধুরী বর্তমান রাজা/বোমাং সার্কেল  চীফ। দেশি-বিদেশী পর্যটকের চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে বান্দরবানে গড়ে উঠেছে ছোট বড়  অসংখ্য পর্যটন কেন্দ্র। মেঘলা, নীলাচল, শৈল প্রপাত, চিম্বুক, নীলগিরি, রাজবাড়ি, কুহালং জাদি, প্রান্তিক লেক ইত্যাদি পর্যটন কেন্দ্র পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ভাষা ও সংস্কৃতি

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল অবস্থিত। এখানে রয়েছে অসংখ্য গিরি, নির্ঝরণী, হ্রদ এবং অরণ্য। এর আয়তন হলো ৫০৯৮ বর্গমাইল। এর উত্তর ও দক্ষিণ পূর্বে বার্মার আরাকান পার্বত্য অঞ্চল, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, উত্তর পূর্বে ত্রিপুরা এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা অবস্থিত। প্রাচীনকাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বরাবরই দুর্গম অরণ্যাবৃত বনভূমি ছিল। পাহাড়ে জুমচাষী, পশু শিকারী, অরণ্যচারী গোষ্ঠীবদ্ধ কয়েকটি পাহাড়ী নৃ-গোষ্ঠীর সমাজ ছাড়া অন্য কোন সমাজ কিংবা সভ্যতা এ অঞ্চলে কখনো গড়ে উঠেনি বা ঠাঁই করেনি। অতীতে এ অঞ্চলকে (বার্মাসহ) কিরাত ভূমি নামে অভিহিত করা হতো। পরবর্তীকালে এ অঞ্চলটি কুকীল্যান্ড নামেও পরিচিতি লাভ করে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের কারণে এবং জীবনযাত্রার প্রয়োজনে পরবর্তীতে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর অভিগমন ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আরণ্য জনপদগুলোতে প্রত্যেক নৃ-গোষ্ঠীই বহিঃশত্রম্নর আক্রমণ সংঘবদ্ধভাবে প্রতিহত করার জন্য গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাপন করে থাকে। একই গোষ্ঠীভূক্ত কয়েকটি নৃ-গোষ্ঠীর পরিবারের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গ্রাম। পার্বত্য অঞ্চলে সাধারণত কয়েক মাইল ব্যবধানে এক একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গ্রাম লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি বা কাছাকাছি একাধিক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গ্রাম গড়ে ওঠার রেওয়াজ যেমন নেই তেমনি কোন এক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গ্রামে অন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাসেরও নজির নেই। বংশ পরম্পরায় এভাবে এক একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গ্রাম ক্রমশ বধিষ্ণু গ্রামে রূপামত্মরিত হয়ে নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছে।

উলেস্ন­খ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক ভূখ-টি সৃষ্টি হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসনভূক্ত হয়। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ শাসনাধীন চট্টগ্রাম জেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলটিকে চট্টগ্রামের সমতল ভূমি থেকে আলাদা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক একটি জেলা সৃষ্টি করা হয়। ১৯০০ সালে ব্রিটিশ শাসকেরা ‘‘চিটাগাং হিলট্রাকস ম্যানুয়েল-১৯০০ এ্যাক্ট’’ প্রবর্তন করে নবগঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে এক্সক্লুডেড এরিয়া বা শাসন বহির্ভূত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে দেশের প্রচলিত আইন বহির্ভূত অঞ্চল হিসেবে পার্বত্য চট্টগামকে চাকমা, বোমাং ও মং - এ তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করে তিনজন সার্কেল প্রধান/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর রাজার উপর নিজ নিজ সার্কেলের অভ্যমত্মরীণ আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সামাজিক বিচারকার্য পরিচালনা এবং হেডম্যানের মাধ্যমে প্রজাদের খাজনা আদায়ের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। প্রত্যেক সার্কেলকে অনেকগুলো মৌজায় বিভক্ত করা হয় এবং এই মৌজা প্রধানকে ‘হেডম্যান’ বলা হয়। আবার প্রতিটি মৌজা গঠন করা হয়েছে কয়েকটি গ্রাম নিয়ে এবং প্রত্যেক গ্রাম-প্রধানকে বলা হয় ‘কার্বারী’। সার্কেল প্রধান বা রাজার অধীনে এই হেডম্যান ও কার্বারীরাই মৌজা ও গ্রামের সামাজিক বিচারাদি পরিচালনার ক্ষমতা রাখে। বৃটিশ শাসকদের প্রবর্তিত এরূপ শাসন ব্যবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্ত জমির মালিকানা সরকারের হাতেই রক্ষিত থাকে--অঞ্চলবাসীরা কেবল তাদের সার্কেল প্রদান/রাজার অনুমতি নিয়ে সেসব জমি ভোগ করার অধিকার পায়। সার্কেল প্রধান/রাজার জমির তালুকদারী স্বত্বের পরিবর্তে কেবলমাত্র নিজ নিজ প্রজাদের তালুকদারী স্বত্ব মেনে নেওয়া হয়। তাই বৃটিশ শাসকই সার্কেল প্রধান/রাজার মাধ্যমে পরোক্ষভাবেই প্রজাদের কাছ থেকে পরিবার পিছু বাৎসরিক খাজনা আদায়ের ‘‘রাজপুন্যাহ’’ অনুষ্ঠানের চালু করে। এভাবে আদায়কৃত মোট খাজনার অর্ধেক অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান রেখে অবশিষ্ট অর্ধেক অর্থ দ্বারা সার্কেল প্রধান/রাজাকে সার্কেল পরিচালনার যাবতীয় কাজে ব্যয় করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। মূলত এরূপ শাসন পদ্ধতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনজন সার্কেল প্রধান/রাজার অধীনে প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে নিজস্ব সীমাবদ্ধ গন্ধীতে আবদ্ধ থেকে নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং গোষ্ঠী চেতনাকে সংরক্ষণের সুযোগ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রমের সার্বিক অবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৮৪ সনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত এই জেলার তিনটি মহকুমাকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের আওতায় যথাক্রমে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এই তিনটি পার্বত্য জেলায় উন্নীত করেছে। তবে আজও ১৯০০ সনে প্রবর্তিত রেগুলেশন অনুযায়ী চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেল প্রধান/রাজারাই নিজ নিজ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সামাজিক বিচারাদি এবং প্রজাদের সমুদয় খাজনা সংগ্রহ করে থাকে। ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস এই পার্বত্য চট্টগ্রামে। প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। 

এ সমস্ত নৃ-গোষ্ঠীদের ভাষা ইন্দো-সিয়ানিজ-চাইনিজ ও টিবেটো-বর্মান পরিবারভূক্ত। জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বৈসাদৃশ্য থাকলেও জুমচাষ নির্ভর জীবিকা, বসতবাড়ি নির্মাণ ও আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে রয়েছে অনেকটাই মিল। ১১টি নৃ-গোষ্ঠী হলো (১) চাকমা, (২) মারমা, (৩) ত্রিপুরা, (৪) ম্রো, (৫) তঞ্চঙ্গ্যা, (৬) বম, (৭) পাংখোয়া, (৮) চাক, (৯) খেয়াং, (১০) খুমী ও (১১) লুসাই।

প্রকৃতির চির সবুজ শৈল শ্রেণীর কোলে গড়া নৈসর্গীক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান পার্বত্য জেলা। বিশ্বের মানচিত্রে এর অবস্থান হচ্ছে পূর্বে ভারত, পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা, দক্ষিণে মায়ানমার ও উত্তরে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা। উলে­খ্য, তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে একমাত্র বান্দরবান পার্বত্য জেলাতেই রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১১টি তথা সকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ভূখ- বান্দরবান পার্বত্য জেলার জনসংখ্যার বিচারে উলে­খিত ১১টি নৃ-গোষ্ঠীদের ক্রমানুসারে সাজানো যেতে পারে।  যেমনঃ- (১) মারমা- ৫৯,২৮৮; (২) ম্রো- ২১,৯৬৩; (৩) ত্রিপুরা- ৮,১৮৭; (৪) বম- ৬,৪২৯; (৫) তঞ্চঙ্গ্যা- ৫,৪৯৩; (৬) চাকমা- ৪,১৬৩; (৭) চাক- ১,৬৮১; (৮) খেয়াং- ১,৪২৫; (৯) খুমী- ১,১৫০; (১০) লুসাই- ২২৬;  (১১) পাঙখোয়া- ৯৯ এবং (১২) অন্যান্য- ২২৯ জন (১৯৯১ সনের সরকারি সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী)। স্বকীয় সামাজিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে প্রতিটি নৃ-গোষ্ঠীই এখানে সম্প্রীতির বন্ধনে নিজেদের বিকাশের গতি ধরে রেখেছে।